শুক্রবার, ৫ মার্চ, ২০২১

আত্ন-কথন - শুন্যতা

 

শুন্যতা মানে ফাঁকা, অথবা থেকেও নেই। আমাদের চারপাশের সব আছের ভিতরে যখন কিছু হারিয়ে যায়, ঠিক তখনকার অব্যাক্ত অনুভূতিই শূন্যতা। আমরা ছোট্টকালে শূন্য লিখতে শিখি, কিন্তু এই শুন্যের ভেতর জীবনের কত শত শূন্যস্থান আছে তা আত্বস্থ করতে পারি না। জীবনের সবচেয়ে ব্যাপক শূন্যস্থান কোথায়? – মহাশূন্যে নাকি মনে নাকি আত্নায়? আমাদের সবার জন্ম ভালবাসায়, আমরা বড় হই নানা রকম ভালবাসার প্রবাহে, আর সেই সাথে আকড়ে ধরি জীবনের মানুষদের। যখন কোন এক জটিল ক্ষণে যদি এই জীবন-চলনে ব্যাঘাত ঘটে – তবেই কি আমরা শূন্যতা অনুভব করি না?

ছোট্টবেলায় একবার পানিতে ডুবে গিয়েছিলাম, মেঘনা নদীর ঘোলা পানিতেঠিক সে মুহূর্তটা আমার এখনো মনে আছে, তলিয়ে যাচ্ছি কোন এক শুন্যতায়। সে শুন্য ক্ষন আমাকে এখনও মাঝে সাঝে গ্রাস করে।

আমার বাবা শক্ত মনের প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন; দেশ ছেড়ে যখন বিঁভূইয়ে যাত্রা ক্ষনের আগে এয়ারপোর্টে সেই বাবার চোখ মুছতে দেখার সময়টাতে - আমার মধ্যে অজানা শূন্যতা তৈরী করেছিল। মন বলছিল কেন অযথাই শুন্যতা তৈরী করছিস ছেড়ে চলে অচেনা গন্তব্যে; কিন্তু শূন্যস্থান তৈরীতে ছেদ ঘটাতে পারি নাই।

সিডনি এয়ারপোর্টে প্রথমবারের মতো যখন বিদায় জানালাম দেড় বছড়ের ছেলে ও স্ত্রীকে কয়েক মাসের জন্য – সে সময়টাতেও এলোমেলো শুন্যতায় বুকে হাহাকার উঠেছিল। মনে হয়েছিল আমি শূন্য হয়ে গেছি, আমার সব থেকেও কিছুই নাই।

এই শুন্যতা তৈরীর বছর ২০২০ এ, এই এক জীবনের সবচেয়ে ভিতরের মানুষ আমার আব্বাকে হারানোর রাতে বুকের ভিতরটায় এক ভীষণ কষ্টে ‘থমকে-যাওয়া’ শুন্যতায় আটকে গেছি। এই শূন্যতা আমাকে সারাজীবনের শুন্যস্থান করে দিয়েছে। ভালবাসা-ভরসা-আশ্রয় সব যেন কেড়ে নিয়েছে। আব্বার রুহটা যখন দেহ ছাড়ল, মনে হচ্ছিল আব্বা যেন হাসছে – ভালবাসার প্রাঞ্জল হাসি। আব্বা আমাদের এক বিশাল ভালবাসার শূন্যস্থান দিয়ে চলে গেলেন অজানায়।

ছেলেবেলায় দেখেছি আমার দাদার অসাধারণ হাতের লেখায় একটা খাতা – যেখানে আছে যোগাসন, দোয়া, নীতি কথা, পরিবারের গাছ। আমার কাছে রাখতাম খাতাটা, ভাল লাগতো। মনে হতো দাদাকে দেখি নাই কিন্তু তার হাতের লেখায় তার গোছানে জীবনাচারনের একটা প্রচ্ছায়া পেলাম। বড় হয়ে দেখলাম আব্বাও একই ভাবে ডায়েরীতে লিখে রাখে অনেক কিছু, পরিবারেরে যোগসূত্র, ঔষধের নাম, ফোন নাম্বার, দরকারী কাজ ইত্যাদি। দাদা-আব্বা-আমি-আমার ছেলেরা একটা পরিবারের গাছের শাখা। গাছের ডালের শক্ত প্রান্তটা যেমন মূল গাছের সাথে থাকে, আমার দাদা-বাবারাও তাই – শক্ত করে আমাদের ধরে আছে যাতে আমরা শূন্যতায় হারিয়ে না যাই। 

#আত্নকথন  #শুন্যতা

বুধবার, ৩ জুলাই, ২০১৯

আত্ন-কথন (বর্ষা সময়)

#বর্ষা-সময় #মাইক্রো-ব্লগ #আত্ন-কথন


১।
বাইরে প্রচন্ড বাতাস, একেবারে উথাল-পাতাল বাতাস, সাথে হাল্কা ঝির ঝির বৃষ্টি, গা হিম হিম করার জন্য যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু। মেলবোর্নের এ সময়টা এরকমই, গায়ে কয়েক স্তরের কাপড় না থাকলে ভীষণ বিপদ – দিন শেষে তখন বাসায় আসতে হবে কাশতে কাশতে, কাপতে কাপতে।  

২।
পৃথিবীর কোথাও এখন ঝির ঝির করে তুষার পড়ছে, আর এখানে পড়ছে বৃষ্টি। দেশে থাকতে সব চেয়ে পছন্দ ছিল আষাঢ়-শ্রাবণ মাস। আমি যেহেতু কখনই খেলা পাগল ছেলে ছিলাম না, তাই ঘরের বাইরে যাওয়ার থেকে বাসায় বসে ভাবনা চিন্তাতেই বেশি আনন্দ পেতাম। এখনকার মতো মনের ভাবনা পরিহারক xbox বা playstation ছিল না আমার, কম্পিঊটার ও ছিল বড্ড পুরোনো-ধীর। চারতলা বাসার দোতলায় এর কোনার বড় ঘরটা ছিল আমার, সাথে বড় বারান্দা। বাসার পুরোনো কাঠের বানানো চেয়ারটায় বসে গ্রীলের ফাঁক দিয়ে সামনে বড় মাঠটায় যখন মুসল ধারে বৃষ্টি পড়তো – তখন মনের কোথায় জানি আনন্দ লাগতো, বড় আনন্দ হতো সামনের শক্ত পীচের ওপর বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনতে, আর সাথে হালকা ঠান্ডা বৃষ্টির আঁচ যখন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেত।

৩।
বর্ষার গল্প কখনও শেষ হয় না, সাথে যদি থাকে মনের মাঝে গল্প লেখার ছল। আরও ছোট কালেও বৃষ্টি দেখেছি বসে বসে। তখন বালক বয়স, বাসার সামনে ছোট্ট মাঠ, বড় ফুলের বাগান, পাশে সবজি, ফলের বাগান – বাসা ভর্তি গাছ-গাছালি। অথচ বাসাটা একেবারে শহরের মাঝখানে, অনেকটা বাংলো বাড়ির মতো। বাসার সামনের গাছে পাখি বসতো, টিয়া পাখি, শালিক পাখি, আরও কত যে নাম না জানা পাখি – বৃষ্টির মধ্যে ভিজে একসা হয়ে থর থর করে কাপতো। পাখির কাপা কাপি দেখি মনটা অস্থির হয়ে উঠতো, কিন্তু কিচ্ছু করার ছিল না। আর এখন আমার ছোট ছেলেকে তার মা, ভয় দেখায় বার্ড বার্ড বলে – কি অদ্ভূত!

সোমবার, ৯ মে, ২০১৬

আত্নকথন (যখন-তখন)

৯ই মে, ২০১৬

কেমন জানি জীবন চলছে, ঠিক যেন বুঝে উঠতে পারছি না। সময়গুলো একটা মধ্যবয়সী জীবনে আটকে ফেলেছে – ঘুম, কাজ, একঘেয়ে ট্রেন, বাসা, বাচ্চাকাচ্চা, এলো-মেলো মন না লাগানো কাজ, তন্দ্রা, আবার ঘুম। এর ঠিক বাইরে বের হতে পারছি না। আজ সকাল বেলায় আকাশ ঘন করে মেঘ জমলো, অফিস ঢুকার পর জানালার কাঁচ ঘোলা করে ঝমাঝম বৃষ্টি পড়লো। আমার কলিগ বললো এটা নাকি বাকেটিং, আক্ষরিক বাংলায় যাকে বলে বালতি উল্টে আকাশ থেকে পানি ঢালা – অনেকটা প্রকৃতি ধুয়ে ফেলার জন্য আকাশ থেকে মেঘগুলোকে পানি করে ছুড়ে ফেলা। আর তারপর আকাশ খালি হয়ে যাওয়ার পর সূর্যদেবের তেড়েফুঁড়ে বের হওয়া – এই না হলে মেল্বোর্ন।



ছোট বেলায় কচিকাচার আসরে কিছু বই বের হতো সেগুলো পড়তাম, একেকটা বই জুড়ে থাকতো কিছু গল্প, কিছু কবিতা। আমি কেন জানি কবিতাগুলো আগে পড়তাম (ছোট বেলায় এমনকি এখনও ছন্দ বেশি ভাল লাগে)।তারপর সেবার তিন গোয়েন্দা, লুকিয়ে নিহারঞ্জনগুপ্তের গোয়েন্দা কাহিনী (কিরিটি রায়, সুব্রত মোটামুটি মাথায় ঢুকে গিয়েছিল)। তবে প্রথম যে বইটি পড়ে চোখের পানি ফেলেছিলাম সেটি হলো রবিঠাকুরের কাবুলিওয়ালা। এখনও মনে আছে ড্রয়িংরুমের খাটের নিচে ঢুকে বোনের পাঠ্যপুস্তকের থেকে কোন এক দুপুরে একমনে ‘কাবুলিওয়ালা’ পড়া শুরু করি; পড়া যখন শেষ হয় তখন বুঝতে পারলাম চোখের জলে বইয়ের পাতা ভিজে গেছে। এইরকম বৃষ্টিভেজা দিনের দুপুরে আবার কোন একটা বই পড়তে ইচ্ছা করে যেখানে মনের আবেগটা থমকে না থেকে দমকে দমকে বের হবে, চোখ ভিজবে, মন ভিজবে – যেমনটা প্রকৃতি মেঘ উল্টো করে ভিজিয়ে দেয় এই শহরটাকে যখন-তখন।

শুক্রবার, ৪ জুলাই, ২০১৪

আত্নকথন (শীত কাল)

শীতকাল আমার ভাল লাগে না, বাংলাদেশে থাকলে ভাল লাগত শরৎ আর হেমন্তকাল অথবা বৃষ্টির দিনে বারান্দায় বসে সবুজ মাঠের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির ঝমঝমানি দেখা। শীতকালটাকে আমার অনেকটা বিয়োগান্তক লাগে – পাতা ঝরে যায়, ঠান্ডা হিম হিম বাতাস, গায়ে জড়াতে হয় মোটা মোটা কাপড় – খালি মনে হয় কোথায় যাই! এখানকার (মেল্বোর্নে) শীতটা আসে জুনের শুরুতেই – অনেকটা অনেক কোম্পানির নতুন ফিনান্সিয়াল বছর শুরু করার মতো। বছরের ঠিক মাঝ বরাবর একটা ঠান্ডা আমদানিকারক বৃষ্টি সপ্তাহ যায় আর ঠিক তারপরেই শুরু হয় জমাট ঠান্ডা। এই জমাট ঠান্ডা কতটা ঠান্ডা তা আরও ভালভাবে বোঝা যায় যদি কপালগুনে কোন পাহাড়ি এলাকার কাছাকাছি থাকা হয়। সবচে উদ্বিগ্নের ব্যাপার হয় যখন এর সাথে যোগ হয় ঝড়ো বাতাস। আহা কি সে বাতাস, একবার যদি নাকমুখ দিয়ে ঢুকে তবে তা হাঁচি-সর্দির এক পরিনত ভার্সন হয়ে বের হবে।

আমার প্রতিদিন সকালে গাড়ি পার্কের পাশে ফেলে ট্রেনে চেপে অফিসাভিমুখী হতে হয়, সাউদার্নক্রস নামের একটা স্টেশন এ নামি – এটা মেলবোর্নের সবচেয়ে বড় নতুন আর্কিটেকচারে তৈরী স্টেশন, দেখতে অনেকটা কমলাপুর রেলস্টেশনের মতো – তবে বানানো স্টিলের ফ্রেম দিয়ে। কিন্তু কি এককারনে জানিনা, এখানে গরমের দিনেও হিম হিম করা ঠান্ডা লাগে (আমার ধারনা এর #Roof Fluid Dynamics এর জন্য) – আর শীতের দিনের কথা আর নাইবা বললাম। সাধারন ঠান্ডাতেও হাড় কনকনে বাতাস কোন ফাকফোকড় থেকে বইতে শুরু করে কে জানে।

প্রচুর বিষোদাগার শেষে এখন একটু ভাল দিকও বলি, শীতকালের সবচেয়ে সুন্দর দিক হচ্ছে হালকা রোদের আনাগোনা আর সকালের শিশির ভেঁজা - ঘাস ঠিকরে বের হওয়া আলোর ঝলকানি। আমার বাসার সামনে নতুন করে ঘন ঘাস উঠেছে শীতের ঠিক আগে আগে, সেই ঘাসে সারারাত একটু একটু করে শিশির জমে – সকালে যখন কাঁপতে কাঁপতে বাসা থেকে বের হই, তখন চোখের কোনায় জমে থাকা অশ্রুবিন্দুর মতো ঘাসের শীষে জমে থাকা শিশির দেখি – আর সাথে সাথে মনটা মুহূর্ত ভাললাগায় ভরে যায়। তাই আমি আমার সন্তানকে বলে যাব, খেয়াল রেখ আমার শেষ শয়নের উপর যাতে সবুজ ঘাস থাকে আর থাকে যাতে শীতের সকালের ভালবাসার শিশির – যার অনুভবে বুঝতে পারবে কতটা স্বম্প সময় নিয়ে আমাদের এই পৃথিবীতে আসা, আর কতটা ভালবাসা নিয়ে আমাদের সময় আঁকড়ে ধরার নাজুক চেষ্টা ...।