সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আত্নকথন - বাবা-দিবস ২০২১

অনেক বছর আগে , আমি ক্লাস ফোর বা ফাইভে পড়তাম, ভোর বেলায় (প্রায় সকাল ৫ঃ৩০টার দিকে) আব্বা আমাকে আর বড়-আপাকে নিয়ে হাটতে বের হতো। তার আগে আব্বা নামাজ পড়ে নিতো, আগের রাতের চিরতা পানিতে ভিজিয়ে রাখা রস সকাল বেলায় খেয়ে নিতে হতো (যদিও ব্যপারটা মোটেই সুখকর ছিল না)। আমরা এয়ারপোর্ট রোডের পাশ দিয়ে, নতুন বানানো স্বাধীনতা ফোয়ারা দেখতে দেখতে, লাল দিঘীর মাঠ ঘেসে (যেটা এখন নভো থিয়েটার) চন্দ্রিমা উদ্দানের দিকে যেতাম। আর আমি দিতাম দৌড়, আব্বা আর বড়-আপার সাথে হাটতে একঘেয়ে লাগতো, তার থেকে দৌড় দিয়ে জিয়ার কবরের পাশের ঢালু অংশটা ঘেসে উপরে উঠতাম, কখনও সেখানে পৌছে শুয়ে থাকতাম আর আপেক্ষা করতাম আব্বার পৌছানো পর্যন্ত। 
 
এই সময়টাতে আমার কাছে জীবন ছিল সাদামাটা, সকালে ঘুম থেকে উঠো, আব্বার সাথে প্রাতঃভ্রমন, বাসায় এসে স্কুলে যাওয়ার আগে একটু পড়া, ১০ টার দিকে স্কুল, বিকেলে বাসায় আসা, আর মাঝে মধ্যে বাসার সামনের মাঠে খেলতে যাওয়া। খেলা ধূলায় আমার অনীহা ছিল না, কিন্তু আমার বাসার সবার ধারনা ছিল, আমি নাকি চিন্তা ভাবনা করে বলে লাথি দিতাম। 
 
বিকেলের দিকে আরেকটা ব্যাপার দেখতাম আব্বা সারাদিন অফিস শেষে মনের আনন্দে বাগানের পরিচর্যা করছে - এত আনন্দ নিয়ে কেউ বাগান করে এটা দেখাটাও একটা আনন্দ। আব্বার বাগানে হরেক রকমের গোলাপ ছিল, ক্যাক্টাস ছিল, বাসার গেটের সামনে ছিল বেলি ফুল, হাসনা হেনা। গোল্ডের শাওয়ারের একটা গাছ প্রতি বসন্তে আগুন ঝলসানো রূপ দেখাতো বাসার গ্রিলের উপর। সকাল বেলায় দেখতাম ঝাঁক বেধে ফুটতো এইট-ও-ক্লক আর নাইন-ও-ক্লক। এমনকি সন্ধ্যায় সামনের বারান্দায় যখন পড়তে বসতাম, কখনও পেতাম বেলী ফুলের সুবাস আবার কখনো হাস্না হেনার মোহ জাগানিয়া আবেশ। 
 
অনেকগুলো সময় হারিয়ে গেলেও স্মৃতি গুলো হারিয়ে যায়নি। আব্বার হাসিমাখা চেহারার সাথে, আনন্দ মিশানো অনুভূতি আছে, ভালবাসাময় গুচ্ছ গুচ্ছ স্মৃতি আছে, আর আছে অনাবিল প্রশান্তি। একটা বাবা যখন তার সন্তানদের জীবন থেকে চলে যায়, রেখে যায় স্নৃতিময় মহাকাব্য। এই মহাকাব্য প্রত্যেকটা সন্তানের হৃদয়ে গেথে থাকে শেষকাল পর্যন্ত। এই গত বছরও আব্বাকে হ্যাপি ফাদার্স ডে বলেছিলাম, বলেছিলাম আব্বা করোনার সময়কাল শেষ হলেই চলে আসো আবার মেলবোর্নে - ভিসা তো আছেই। এই বছরও আমি হ্যাপি ফাদার্স ডে বলছি আব্বাকে - "আব্বা যেখানেই থাকো ভাল থাকো, আল্লাহ তোমাকে খুব ভাল রাখুক"। 
 
আমার সন্তানরা আমার জন্য কার্ড বানায়, বঊ খাওয়া বানায়, ভালবাসার মায়া বারবার তৈরী হয় বারবার এই দিনে - আর চেষ্টায় থাকি, আমিও যেন ভালবাসার স্মৃতিময় মহাকাব্য রেখে যেতে পারি সন্তানদের জন্য। সব বাবাদের জন্য রইল ভালবাসা। 
 
#বাবা-দিবস #২০২১

শুক্রবার, ৫ মার্চ, ২০২১

আত্ন-কথন - শুন্যতা

 

শুন্যতা মানে ফাঁকা, অথবা থেকেও নেই। আমাদের চারপাশের সব আছের ভিতরে যখন কিছু হারিয়ে যায়, ঠিক তখনকার অব্যাক্ত অনুভূতিই শূন্যতা। আমরা ছোট্টকালে শূন্য লিখতে শিখি, কিন্তু এই শুন্যের ভেতর জীবনের কত শত শূন্যস্থান আছে তা আত্বস্থ করতে পারি না। জীবনের সবচেয়ে ব্যাপক শূন্যস্থান কোথায়? – মহাশূন্যে নাকি মনে নাকি আত্নায়? আমাদের সবার জন্ম ভালবাসায়, আমরা বড় হই নানা রকম ভালবাসার প্রবাহে, আর সেই সাথে আকড়ে ধরি জীবনের মানুষদের। যখন কোন এক জটিল ক্ষণে যদি এই জীবন-চলনে ব্যাঘাত ঘটে – তবেই কি আমরা শূন্যতা অনুভব করি না?

ছোট্টবেলায় একবার পানিতে ডুবে গিয়েছিলাম, মেঘনা নদীর ঘোলা পানিতে – ঠিক সে মুহূর্তটা আমার এখনো মনে আছে, তলিয়ে যাচ্ছি কোন এক শুন্যতায়। সে শুন্য ক্ষন আমাকে এখনও মাঝে সাঝে গ্রাস করে।

আমার বাবা শক্ত মনের প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন; দেশ ছেড়ে যখন বিঁভূইয়ে যাত্রা ক্ষনের আগে এয়ারপোর্টে সেই বাবার চোখ মুছতে দেখার সময়টাতে - আমার মধ্যে অজানা শূন্যতা তৈরী করেছিল। মন বলছিল কেন অযথাই শুন্যতা তৈরী করছিস ছেড়ে চলে অচেনা গন্তব্যে; কিন্তু শূন্যস্থান তৈরীতে ছেদ ঘটাতে পারি নাই।

সিডনি এয়ারপোর্টে প্রথমবারের মতো যখন বিদায় জানালাম দেড় বছড়ের ছেলে ও স্ত্রীকে কয়েক মাসের জন্য – সে সময়টাতেও এলোমেলো শুন্যতায় বুকে হাহাকার উঠেছিল। মনে হয়েছিল আমি শূন্য হয়ে গেছি, আমার সব থেকেও কিছুই নাই।

এই শুন্যতা তৈরীর বছর ২০২০ এ, এই এক জীবনের সবচেয়ে ভিতরের মানুষ আমার আব্বাকে হারানোর রাতে বুকের ভিতরটায় এক ভীষণ কষ্টে ‘থমকে-যাওয়া’ শুন্যতায় আটকে গেছি। এই শূন্যতা আমাকে সারাজীবনের শুন্যস্থান করে দিয়েছে। ভালবাসা-ভরসা-আশ্রয় সব যেন কেড়ে নিয়েছে। আব্বার রুহটা যখন দেহ ছাড়ল, মনে হচ্ছিল আব্বা যেন হাসছে – ভালবাসার প্রাঞ্জল হাসি। আব্বা আমাদের এক বিশাল ভালবাসার শূন্যস্থান দিয়ে চলে গেলেন অজানায়।

ছেলেবেলায় দেখেছি আমার দাদার অসাধারণ হাতের লেখায় একটা খাতা – যেখানে আছে যোগাসন, দোয়া, নীতি কথা, পরিবারের গাছ। আমার কাছে রাখতাম খাতাটা, ভাল লাগতো। মনে হতো দাদাকে দেখি নাই কিন্তু তার হাতের লেখায় তার গোছানে জীবনাচারনের একটা প্রচ্ছায়া পেলাম। বড় হয়ে দেখলাম আব্বাও একই ভাবে ডায়েরীতে লিখে রাখে অনেক কিছু, পরিবারেরে যোগসূত্র, ঔষধের নাম, ফোন নাম্বার, দরকারী কাজ ইত্যাদি। দাদা-আব্বা-আমি-আমার ছেলেরা একটা পরিবারের গাছের শাখা। গাছের ডালের শক্ত প্রান্তটা যেমন মূল গাছের সাথে থাকে, আমার দাদা-বাবারাও তাই – শক্ত করে আমাদের ধরে আছে যাতে আমরা শূন্যতায় হারিয়ে না যাই। 

#আত্নকথন  #শুন্যতা

বুধবার, ৩ জুলাই, ২০১৯

আত্ন-কথন (বর্ষা সময়)

#বর্ষা-সময় #মাইক্রো-ব্লগ #আত্ন-কথন


১।
বাইরে প্রচন্ড বাতাস, একেবারে উথাল-পাতাল বাতাস, সাথে হাল্কা ঝির ঝির বৃষ্টি, গা হিম হিম করার জন্য যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু। মেলবোর্নের এ সময়টা এরকমই, গায়ে কয়েক স্তরের কাপড় না থাকলে ভীষণ বিপদ – দিন শেষে তখন বাসায় আসতে হবে কাশতে কাশতে, কাপতে কাপতে।  

২।
পৃথিবীর কোথাও এখন ঝির ঝির করে তুষার পড়ছে, আর এখানে পড়ছে বৃষ্টি। দেশে থাকতে সব চেয়ে পছন্দ ছিল আষাঢ়-শ্রাবণ মাস। আমি যেহেতু কখনই খেলা পাগল ছেলে ছিলাম না, তাই ঘরের বাইরে যাওয়ার থেকে বাসায় বসে ভাবনা চিন্তাতেই বেশি আনন্দ পেতাম। এখনকার মতো মনের ভাবনা পরিহারক xbox বা playstation ছিল না আমার, কম্পিঊটার ও ছিল বড্ড পুরোনো-ধীর। চারতলা বাসার দোতলায় এর কোনার বড় ঘরটা ছিল আমার, সাথে বড় বারান্দা। বাসার পুরোনো কাঠের বানানো চেয়ারটায় বসে গ্রীলের ফাঁক দিয়ে সামনে বড় মাঠটায় যখন মুসল ধারে বৃষ্টি পড়তো – তখন মনের কোথায় জানি আনন্দ লাগতো, বড় আনন্দ হতো সামনের শক্ত পীচের ওপর বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনতে, আর সাথে হালকা ঠান্ডা বৃষ্টির আঁচ যখন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেত।

৩।
বর্ষার গল্প কখনও শেষ হয় না, সাথে যদি থাকে মনের মাঝে গল্প লেখার ছল। আরও ছোট কালেও বৃষ্টি দেখেছি বসে বসে। তখন বালক বয়স, বাসার সামনে ছোট্ট মাঠ, বড় ফুলের বাগান, পাশে সবজি, ফলের বাগান – বাসা ভর্তি গাছ-গাছালি। অথচ বাসাটা একেবারে শহরের মাঝখানে, অনেকটা বাংলো বাড়ির মতো। বাসার সামনের গাছে পাখি বসতো, টিয়া পাখি, শালিক পাখি, আরও কত যে নাম না জানা পাখি – বৃষ্টির মধ্যে ভিজে একসা হয়ে থর থর করে কাপতো। পাখির কাপা কাপি দেখি মনটা অস্থির হয়ে উঠতো, কিন্তু কিচ্ছু করার ছিল না। আর এখন আমার ছোট ছেলেকে তার মা, ভয় দেখায় বার্ড বার্ড বলে – কি অদ্ভূত!

সোমবার, ৯ মে, ২০১৬

আত্নকথন (যখন-তখন)

৯ই মে, ২০১৬

কেমন জানি জীবন চলছে, ঠিক যেন বুঝে উঠতে পারছি না। সময়গুলো একটা মধ্যবয়সী জীবনে আটকে ফেলেছে – ঘুম, কাজ, একঘেয়ে ট্রেন, বাসা, বাচ্চাকাচ্চা, এলো-মেলো মন না লাগানো কাজ, তন্দ্রা, আবার ঘুম। এর ঠিক বাইরে বের হতে পারছি না। আজ সকাল বেলায় আকাশ ঘন করে মেঘ জমলো, অফিস ঢুকার পর জানালার কাঁচ ঘোলা করে ঝমাঝম বৃষ্টি পড়লো। আমার কলিগ বললো এটা নাকি বাকেটিং, আক্ষরিক বাংলায় যাকে বলে বালতি উল্টে আকাশ থেকে পানি ঢালা – অনেকটা প্রকৃতি ধুয়ে ফেলার জন্য আকাশ থেকে মেঘগুলোকে পানি করে ছুড়ে ফেলা। আর তারপর আকাশ খালি হয়ে যাওয়ার পর সূর্যদেবের তেড়েফুঁড়ে বের হওয়া – এই না হলে মেল্বোর্ন।



ছোট বেলায় কচিকাচার আসরে কিছু বই বের হতো সেগুলো পড়তাম, একেকটা বই জুড়ে থাকতো কিছু গল্প, কিছু কবিতা। আমি কেন জানি কবিতাগুলো আগে পড়তাম (ছোট বেলায় এমনকি এখনও ছন্দ বেশি ভাল লাগে)।তারপর সেবার তিন গোয়েন্দা, লুকিয়ে নিহারঞ্জনগুপ্তের গোয়েন্দা কাহিনী (কিরিটি রায়, সুব্রত মোটামুটি মাথায় ঢুকে গিয়েছিল)। তবে প্রথম যে বইটি পড়ে চোখের পানি ফেলেছিলাম সেটি হলো রবিঠাকুরের কাবুলিওয়ালা। এখনও মনে আছে ড্রয়িংরুমের খাটের নিচে ঢুকে বোনের পাঠ্যপুস্তকের থেকে কোন এক দুপুরে একমনে ‘কাবুলিওয়ালা’ পড়া শুরু করি; পড়া যখন শেষ হয় তখন বুঝতে পারলাম চোখের জলে বইয়ের পাতা ভিজে গেছে। এইরকম বৃষ্টিভেজা দিনের দুপুরে আবার কোন একটা বই পড়তে ইচ্ছা করে যেখানে মনের আবেগটা থমকে না থেকে দমকে দমকে বের হবে, চোখ ভিজবে, মন ভিজবে – যেমনটা প্রকৃতি মেঘ উল্টো করে ভিজিয়ে দেয় এই শহরটাকে যখন-তখন।

শুক্রবার, ৪ জুলাই, ২০১৪

আত্নকথন (শীত কাল)

শীতকাল আমার ভাল লাগে না, বাংলাদেশে থাকলে ভাল লাগত শরৎ আর হেমন্তকাল অথবা বৃষ্টির দিনে বারান্দায় বসে সবুজ মাঠের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির ঝমঝমানি দেখা। শীতকালটাকে আমার অনেকটা বিয়োগান্তক লাগে – পাতা ঝরে যায়, ঠান্ডা হিম হিম বাতাস, গায়ে জড়াতে হয় মোটা মোটা কাপড় – খালি মনে হয় কোথায় যাই! এখানকার (মেল্বোর্নে) শীতটা আসে জুনের শুরুতেই – অনেকটা অনেক কোম্পানির নতুন ফিনান্সিয়াল বছর শুরু করার মতো। বছরের ঠিক মাঝ বরাবর একটা ঠান্ডা আমদানিকারক বৃষ্টি সপ্তাহ যায় আর ঠিক তারপরেই শুরু হয় জমাট ঠান্ডা। এই জমাট ঠান্ডা কতটা ঠান্ডা তা আরও ভালভাবে বোঝা যায় যদি কপালগুনে কোন পাহাড়ি এলাকার কাছাকাছি থাকা হয়। সবচে উদ্বিগ্নের ব্যাপার হয় যখন এর সাথে যোগ হয় ঝড়ো বাতাস। আহা কি সে বাতাস, একবার যদি নাকমুখ দিয়ে ঢুকে তবে তা হাঁচি-সর্দির এক পরিনত ভার্সন হয়ে বের হবে।

আমার প্রতিদিন সকালে গাড়ি পার্কের পাশে ফেলে ট্রেনে চেপে অফিসাভিমুখী হতে হয়, সাউদার্নক্রস নামের একটা স্টেশন এ নামি – এটা মেলবোর্নের সবচেয়ে বড় নতুন আর্কিটেকচারে তৈরী স্টেশন, দেখতে অনেকটা কমলাপুর রেলস্টেশনের মতো – তবে বানানো স্টিলের ফ্রেম দিয়ে। কিন্তু কি এককারনে জানিনা, এখানে গরমের দিনেও হিম হিম করা ঠান্ডা লাগে (আমার ধারনা এর #Roof Fluid Dynamics এর জন্য) – আর শীতের দিনের কথা আর নাইবা বললাম। সাধারন ঠান্ডাতেও হাড় কনকনে বাতাস কোন ফাকফোকড় থেকে বইতে শুরু করে কে জানে।

প্রচুর বিষোদাগার শেষে এখন একটু ভাল দিকও বলি, শীতকালের সবচেয়ে সুন্দর দিক হচ্ছে হালকা রোদের আনাগোনা আর সকালের শিশির ভেঁজা - ঘাস ঠিকরে বের হওয়া আলোর ঝলকানি। আমার বাসার সামনে নতুন করে ঘন ঘাস উঠেছে শীতের ঠিক আগে আগে, সেই ঘাসে সারারাত একটু একটু করে শিশির জমে – সকালে যখন কাঁপতে কাঁপতে বাসা থেকে বের হই, তখন চোখের কোনায় জমে থাকা অশ্রুবিন্দুর মতো ঘাসের শীষে জমে থাকা শিশির দেখি – আর সাথে সাথে মনটা মুহূর্ত ভাললাগায় ভরে যায়। তাই আমি আমার সন্তানকে বলে যাব, খেয়াল রেখ আমার শেষ শয়নের উপর যাতে সবুজ ঘাস থাকে আর থাকে যাতে শীতের সকালের ভালবাসার শিশির – যার অনুভবে বুঝতে পারবে কতটা স্বম্প সময় নিয়ে আমাদের এই পৃথিবীতে আসা, আর কতটা ভালবাসা নিয়ে আমাদের সময় আঁকড়ে ধরার নাজুক চেষ্টা ...।    

মঙ্গলবার, ১০ জুন, ২০১৪

মাইক্রো ব্লগ/দিনলিপি (ছেলের জন্মদিন)

ফেব্রুয়ারীতে লেখা মাইক্রো ব্লগঃ

বাসা ছাড়তে হবে এ’মাসের শেষে; সাথে নতুন বাসায় উঠার সাথে সাথে রাজ্যের কাজ-কারবার শুরু হবে, এদিক দিয়ে অফিসে কাজের মহা চাপ  - এমনি অভূতপূর্ব সময়ে ছেলে আমার ৫ এ পড়লো। বাসায় কোন আয়োজন নাই, কারন সেই একই অযুহাত – ব্যাস্ততায় ব্যাতিব্যাস্ত। সময় করে একটা খেলনার দোকানে গিয়ে ছেড়ে দিলাম ছেলেকে তার পছন্দের খেলনা কিনার, খেলনা দিয়ে ছেলের মন ভুলানো আর কি! এরই মাঝে ছেলেকে নিয়ে স্কুলে গিয়ে শুনি তার নাকি আধা ঘন্টার পরীক্ষা হবে ; আর সময় শেষে ছেলে তার টিচারকে অবাক করে দিয়ে সবচেয়ে ভাল পরীক্ষা দিয়ে বসে। পরে বুঝলাম এটা পুরোটাই ছেলের মায়ের দিন শেষে ছেলেকে নিয়ে বসার কৃতিত্ব। 

দেশ থেকে কথনের দাদা-দাদী, নানা-নানী, খালা, ফুপু, আপুরা ফোনে wish করতে লাগলো; ছেলে নতুন শেখা সালামের উত্তর-প্রতি উত্তর জানাতে লাগলো। সবশেষে ছেলে যখন ঘুমে আমার আর ছেলের মায়ের মন খারাপ – সময় করে একটা কেকও আনলাম না দেখে। নামায পড়ে দোয়া করলাম আল্লাহর কাছে, ছেলেটা যাতে বেঁচে থাকে সব বিপদ থেকে, হয় যেন বড় মনের মানুষ।  

বুধবার, ৮ জানুয়ারি, ২০১৪

আত্নকথন (১৩-র শেষে অদেখার শুরু)

প্রতি জানুয়ারী মাস শুরু হবার আগে ও পরে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করে। আগের অস্বস্তি হলো – “ধুর আবার একটা বছর জীবন থেকে নাই হয়ে গেল - রং চং হীন, নিরস-নির্জীব”। আর পরের অস্বস্তি হলো – “আবার আরেকটা বছর, কেমন জানি ভয় ধরানো অনুভূতি, না জানি কপালে কি আছে!”। এই আগে-পরের গ্যারাকলে পড়ে আমার কখনই আলাদা করে নতুন বছর শুরুর আনন্দ করা হয় না।

আমি যে রসকসহীন মানুষ এটা আমার কাছের মানুষজন খুব ভালভাবে জানে; নিজের মধ্যে থাকার তীব্র প্রবনতা কখনই ভাংতে পারি নাই। তবুও মাঝে সাঝে সহজ-সরল ব্যাপারগুলো আনন্দ দেয় – এই যেমন ছেলের সাথে বাবাময়তায় বন্ধু সাজা, বউয়ের সাথে ছোট্ট ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে হাসি-ঠাট্টা, মানুষের কাজ-কারবার নিরব ভাবে পর্যবেক্ষন করা, দেশের ছেলেদের ক্রিকেট খেলা দেখা, হাবিজাবি। এর মাঝে কেউ যদি আমাকে বলে – ‘বিভূঁয়ের কি ভাল লাগে?’ এক্ষেত্রে আমার কাছে অনেকক্ষেত্রে উত্তর নেই, আবার কিছুর উত্তরও আছে। কিছু দেশি মানুষের এই দূর বিভূঁই খুবই ভাল লাগে, এমনকি নিজ দেশের থেকেও বেশি। তাদের কথা বার্তা শুনলে মাঝে মাঝে আমার কাছে বিষের মতো লাগে; কিন্তু আমি স্বভাবজাত নিয়মে কিছুই বলি না – মুখ তেতো করে বসে থাকি।

২০১৩ সালে আমি হুট করেই মেলবোর্নে কাঠ-পাকা বাড়ি বানানোর সিদ্ধান্ত নেই; কাঠ-পাকা বললাম, কারন এখানকার বাড়িগূলার মধ্যে কাঠের আধিক্য বেশি (ফাঁপা ইটের মাঝে কাঠ)। আমি খেয়াল করেছি বড় বড় সিদ্ধান্তগুলি আমি হুট করে নেই, লম্বা সময় চিন্তা করে নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর থেকে, কম সময় ধরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো ভাল হয়। বাড়ি বানানোর সিদ্ধান্ত যতটা তাড়াতাড়ি নিয়েছি, সম্পর্কিত কিছু ছোট-খাট কাজের সিদ্ধান্তগুলা একদমই তাড়াতাড়ি নিতে পারছি না। যতই ভাবনা-চিন্তা-আলাপের মধ্যে যাচ্ছি; ততই মনে হচ্ছে, এই বুঝি কাজের যতি পড়বে।

আগামী বছর (২০১৫) মেলবোর্নে বাংলাদেশ টি২০-র বিশ্বকাপে একটা ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে আসবে; আগ বাড়িয়ে রেজিস্ট্রেশন করে রাখলাম। জানিনা টিকেট পাব কিনা, তবুও কেন জানি অযথা চিন্তা করে যাচ্ছি। সবচেয়ে মজার কথা হলো, এমসিজি বাসার কত কাছে – অথচ ১৭৫ বছরের পুরোনো এই ক্লাব মাঠে এখনও যাই যাই করেও কেন জানি যাওয়া হয় নাই।

জীবনে কতকিছু এভাবে করা হয় নাই, হবেও না – এটা চলতেই থাকবে; ভাববো এই বছর না, পরের বছর করব – আশায় থাকি, আশাতেই থাকি, করা আর হয় না। এভাবে একটা সময় জীবনের শেষ বছরটা আসবে, শেষ বেলাটা আসবে, আসবে শেষটুকু সন্ধ্যা – আমি আশাতে থাকব শেষ সন্ধ্যার সোনালি সূর্‍্যের শেষ আভাটা দেখার – হয়তো দেখাই হবে না, আবার হয়তো সবই হবে।           

বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৩

মনের রং ...

কানের সামনে সারাক্ষন চোস্ত ইংরেজি’ শুনতে শুনতে কান কেমন জানি অবস অবস লাগে; দেশ ছাড়ার তিন বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও – এখনও নিজেকে পুরোপুরি অভ্যস্ত করে তুলতে পারি নাই। দেখা যাক আর কতদিন লাগে এই অনভ্যস্ততা কাটিয়ে উঠতে। মনে আছে দেশ ছাড়ার সময় মায়ের ভিজে উঠা চোখে একমাত্র ছেলেকে দূরে চলে যাওয়া রোধ করতে না পারার আকুতি; আর বাবার বরাবরের মতোই অভিব্যক্তি লুকানোর করূন চেষ্টা – এ দুটো অভিব্যক্তি বা আবেগায়িত প্রকাশের সাথে আমি কখনই নিজেকে সামলাতে পারিনাই। আর তাই কেন জানি মনে হয়, কিছু জিনিষের সাথে অভ্যস্ততার বা নিজেকে মিশিয়ে ফেলার কোন প্রয়োজন নাই – প্রয়োজন নাই খুব বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠার মন না চাওয়া পরিবেশের সাথে। যদিও অনেকেই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়ে ফেলে সময়ের সাথে সাথে দেশের প্রতি; ভুলে যাওয়ার মিথ্যে অভিনয় করে – কতটা বদলে গেলে নিজেকে রুপক সমাসের মধ্যে পুরোপুরি ফেলে দিতে পারে – সেই চেষ্টা। কিন্তু ভাগ্য বিধাতা, বড্ড নিষ্ঠুর; দেশ ফেলে আসা পরবাসী মানুষদের পুরোপুরি পাল্টাতে দেয় না – তাই হয়তো অনেকেরই শেষ যাত্রাটা হয় দেশের পানেই।

অস্ট্রেলিয়ায় এসে যে রংটা আমার বেশি চোখে পড়েছে – হয় সাদা না হয় কালো; আমার নতুন অফিসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে বড় বড় দালানগুলার রং-বন্ধন হলো সাদা আর কালো; বাসে-ট্রেনে-ট্রামে উঠলে মানুষের পোশাকে কালো-সাদার আধিক্য অনেক ক্ষেত্রে বাহুল্যও বলা যেতে পারে; আর বৃষ্টির দিনে বড় বড় কালো ছাতাতো আছেই ...। যাই হোক কালো-সাদার কথা বললাম কারন, ডিসেম্বর মাসে ক্রিসমাসের আগে এখানে কড়কড়ে লালটা আর বাকি সব রংকে হারিয়ে দেয় – রাস্তার উপর লাল রঙ্গের তোড়ন, দোকানে-রাস্তায়-এমনকি মানুষের পোষাকেও লাল রঙ্গের ছোয়া, সব রকমের বিজ্ঞাপনে লালটাই আসল ব্যাকগ্রাউন্ড কালার। কিন্তু এতো কিছুর পরও আমার ভিতর ডিসেম্বর মানে সবুজ আর কিছুটা লাল। ডিসেম্বর আসলেই লাল-সবুজ টাকে বেশি করে মনে হয় যেন – “মনের ভিতরের রং, ভালবাসার রং, মায়ার রং, অনুভবের রং, স্বপ্নের রং”।

মানুষ বার বার জন্ম নেয় না – একবার জন্ম নেয়, একটা মাত্র মাতৃভূমি পায়, একবারই কেবল ভালবাসতে শেখে মাতৃভূমির পতাকার রং ... বিজয়ের মাসে আপন দেশের প্রতি ভালবাসা ছড়িয়ে পড়ুক সবার - সবখানে, সবক্ষনে।।      

মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৩

এলার্জি (দাড়ি। কমা, প্রশ্নবোধক?)


“প্রথমেই, ইহা একান্তই নিজস্ব এলার্জি বিষয়ক পোস্ট, কাঊকে কোনপ্রকারে আঘাত করিয়া থাকিলে দুঃখিত”
===============================================================

এলার্জি-১
ট্রেনে বাসায় যাচ্ছি, সামনে এক চুমাখাপো এক ভারতীয় গলা ফাটাইয়া ঘ্যান ঘ্যান করতেছে; এই দেশের মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি মোটামুটি সবসময় শুন্যের কোঠায় থাকে। সারা ট্রেনের মানুষ ব্যাপক বিরক্ত ব্যাটার উপর; আমারি মনে হইতেছে উইঠা গিয়া লাথি মারি।

এলার্জি-২
মেলবোর্নে চাইনীজ এত্তো বেশি দেখা যায় যে মাঝে মাঝে মনে হয় আমি চাঙ্কু দেশে থাকি; এদের ব্যবহার বাসে ট্রেনে শান্তই থাকে (দু-একটা বাদে); এরা ভারতীয়দের মতো কমন সেন্সে এতো ভোতা না।

এলার্জি-৩
প্রথম দিকে ভাবতাম সব সাদা মানেই অজি – যদিও এইখানে থাকতে থাকতে সবাই অজি হয় (বাঙালি বাদে)। বাঙ্গালির ব্যাপক সমস্যা এইখানে – এরা এই ব্যাপারে আধাআধি (অন্য সময় লিখব অস্ট্রেলিয়ায় বাঙ্গালীর কথা, এখন না); যাই হোক সাত রকমের সাদা মানু্ষের ব্যবহারও সাতশ রকমের। এদের চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই আসলে মনের ভেতর এদের কি চলে - কেউ মন ভার করেও সারাদিন মুখ ভর্তি হাসি নিয়ে দিন পার করে, কথায় কথায় বলে ভাল আছি, আর বেশি মেজাজ খারাপ থাকলে শুধুমাত্র বলে ‘not bad’; এরা মনের কথা মনে তালা মেরে রাখতে বড়ই ওস্তাদ।

এলার্জি-৪
এই খানে পিচ্চি পিচ্চি দুধের বাচ্চাদের ডে কেয়ারে বাবা-মাদের ফেলে যাওয়ার মতো হৃদয় বিদারক কাজ মনে হয় আর দ্বিতীয়টি নাই। ডে কেয়ারে বাচ্চারা ঠান্ডায় ফ্লোরে পড়ে থাকে, নির্দিষ্ট পরিমান খাওয়া ভাগ করে খেতে শিখে, ভরা রোদে পুড়তে পুড়তে খেলা শিখে – এগুলো যে খারাপ তা না, কিন্তু আমার অস্বস্তি লাগে যখন ভাবি কি হয় নিজের দেশের মতো সব মা’রা সকাল বেলায় আদর করে বাচ্চাকে খাইয়ে দেবে, নিষেধ করবে ভরা রোদে না যাওয়ার, ছোট বাচ্চার শৈশব পাবে সারাটাক্ষন মায়ের ছায়াতল। 


শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৩

আত্নকথন (গ্রীষ্ম)

খুব গরম এখন মেলবোর্নে, গরম লু হাওয়ায় যেন সবকিছু তিরতির করে কাঁপছে। এখানকার মানুষজন সাধারনত গ্রীষ্মকালটা উপভোগ করার চেষ্টা করে, কিন্তু তারাও যেন এবার এই কাঠফাঁটা গরমে ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো তড়পাচ্ছে। ভেবেছিলাম ক্রিসমাসের ছুটিতে দূরে কোথাও টো টো করে বেড়াব, কিন্তু সেটাও হলো না - কারন রোদের খরতাপে একটু বেরোলেই চামড়া পুড়ে একশা, নিজেকে তখন বার-বি-কিউ মুরগি ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। আমার মাথা ব্যাথার হালকা সমস্যা আছে, বেশি গরমে মাথায় ঝিন ঝিন ব্যাথা করে – রুমটা অন্ধকার করে চুপচাপ শুয়ে থাকতে হয়।  তখন এইরকম একটা গান শুনলে ভাল লাগে -


সোমবার, ২ এপ্রিল, ২০১২

আত্নকথন (বৃষ্টি )

বাইরে আকাশের তর্জন-গর্জন চলছে আকাশ ভাঙ্গবে বলে; অস্ট্রেলিয়ায় সাধারনতঃ ঝুম বৃষ্টি হয় না – এই আসে আর এই যায়। ছন্নছাড়া বৃষ্টি বলা যায়। এখানে থাকাতে এই হুটহাট বৃষ্টির মাঝে বেশ কয়েকবারই পড়তে হয়েছে; আর সাথে শিখতে হয়েছে কিভাবে ঝেড়ে দৌড় দিতে হয়। বাংলাদেশে থাকতে হালকা বৃষ্টির দমকা হাওয়াটা অসাধারন লাগতো। এইখানে পলকা বৃষ্টির সাথে কনকনে ঠান্ডা দমকা হাওয়াটা বিষের মতো মনে হয়। প্রচন্ড শীত আর বৃষ্টির বায়বীয় আবেশ তখন মিলেমিশে একাকার হয়ে শরীরে কাঁটা তুলে জানান দেয়।

আমার মনে আছে দেশে থাকতে একটানা কয়েকদিন বৃষ্টি পড়তো, তখন কেন জানি আমার খুব আনন্দ লাগতো। সবচেয়ে বেশি ভাল লাগতো বাসার সামনের খোলা মাঠটার সবুজ ঘাসগুলো - যা বৃষ্টির পানিতে ক্রমাগত ভিজে ঝা ঝা সবুজাভ হয়ে উঠতো। বেশিরভাগ সময় আমি আমার রুমের সামনের বারান্দায় একটা শক্ত কাঠের চেয়ারে বসে থাকতাম; শক্ত চেয়ারে আলতো হয়ে বসে বৃষ্টিবিলাসে মন মাতিয়ে তুলতাম। এখনো মনে পড়ে কত্তো কথা একা একা বলতাম। কথার মাঝে নিজেকে খুঁজে পাবার তীব্র বাসনাটা আজ অব্দি গেল না।

মনে আছে মাথার চুল ভেঁজা, শরীর ভেঁজা – তবুও শুধু ভাললাগার জন্য কত বৃষ্টির মাঝে হেঁটেছি। ধানমন্ডির চেনা অচেনা গলি পেরিয়ে শুধু ভাললাগাকে সম্বল করে আমার হাঁটা চলতে থাকতো। আর সেই আমি আজ বৃষ্টি থেকে পালাতে ঝেড়ে দৌড় দেই। সময়টা বোধহয় এভাবেই পাল্টায়।

আমার বিশাল রুমে সাতটা কাঁচের জানালা ছিল, মনে আছে যখন কালো আকাশে বিদ্যুত চমকাতো – মনে হতো হাজার ভোল্টের আলো জ্বলে উঠেছে সাত জানালার পাশে; ধবধব করছে জানালার কাঁচগুলো। আমি ভীষন চমকে উঠতাম, কারন কিছুদিন আগেই জানালার পাশের সজনে গাছটা বজ্রাহত হয়েছিল। আহা, আজ আর চমকে উঠি না, ঘুমের মাঝে ছেলেকে বরং জাপটে ধরি - যাতে ও না চমকায়।

রবিবার, ১ এপ্রিল, ২০১২

ছদ্দ

নিজের কিছু ছন্নছাড়া পংক্তি দিলাম এখানে; সময়-অসময়ে ছদ্দ মিলিয়ে পদ্য বানানোর বৃথা চেষ্টাঃ 

১। সময়ের টাইমলাইন ঃ 

শুন্য অদ্ভূতুড়ে আবেগ, জানিনা কার জন্যে,
     জানি শুধু সময় জানে
সময় বলবে কোন এক সময়ে আমায়
     এই তো সেই, যার অপেক্ষায় তুমি।
সবাই মোরা সেই সময়ের প্রতীক্ষায়
     এ সময় যেন আর থমকে না দাড়ায়। 

২। দেশের জন্য যখন নিজের ভেতরটায় হুহু করেঃ 

এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে, সময় কাটে ফুরফুরিয়ে
দিনের শেষে ফিরে দেখি মনটা নিরুদ্বেশ,
মনের ভিতর ধুধু করে, হা হা বাড়ে তরতরিয়ে
ফিরব কবে তোমার কাছে, আমার ছোট্ট দেশ।

৩। নিজের বাড়ন্ত বয়স নিয়ে উদ্বিগ্ন যখনঃ

গল্প হল শুরু, শেষটা কবে গুরু
এমনি করেই চলতে চলতেই হচ্ছি কেবল বুড়ো।

৪। আমার অর্ধাঙ্গিনী যখন চলন্ত গাড়ি থেকে মাইক্রো সাইজের টিস্যু ফেলে লিটারিঙ্গের ফাইন খায়ঃ 

শুভংকরের পুলিশ, বানিয়ে ছাড়ল ফুলিশ ...
বলে দিনে দুপুরে কি যা তা ফেলিস!




মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

দিনাতিপাত-৯

বাসার সামনে বড় বড় বিশাল দুইটা গাছ আছে, গাছ দুইটার নাম জানি না। কারন গাছ আমার ভাল লাগে কিন্তু কোনটা কি গাছ এই সম্পর্কে আমার জ্ঞান শুন্য থেকেও কম। আসলে আমার ধারনা সব কিছু নিয়ে ছোঁকছোঁক জ্ঞান থাকলে মাথায় চাপ পড়ে এবং চাপের কারনে সাধারন যাপিত জীবন যাপন ব্যহিত হয়। এই ধারনায় জীবন দর্শন চালাতে গিয়ে জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এখন দেখি দুয়েকটা বিষয় বাদে অন্যান্য বিষয়ে আমার কোন ধারনাই নেই। মোটামুটি বলা চলে ধারনাহীন জীবন চালাচ্ছি এখন।

ধারনাহীন জীবন যাপনের অনেক উদারন দেয়া যায়। এখন যেমন অনেকটা বিরক্ত হয়েই ব্লগিং করছি। অনেকক্ষন ধরে একটা নতুন কাজ বোঝার চেষ্টা করে মাথা ঝিমঝিম করছে। একদম ধারনার বাইরে আমার এই নতুন কাজ – অনেকটা নভিসের মতো মনে হচ্ছে নিজেকে।

আজকে খানিকটা মাথা ব্যাথা করছে, চোখ দেখিয়েছি কয়েকদিন আগে – চোখের সমস্যা নেই; ঘুমেরও সমস্যা নেই; তাহলে মাথাটার ব্যাথিত হবার কারন টা কি – ধারনা করতে পারছি না।

অফিসে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষ কাজ করে। একেকজনের ব্যবহারে বিস্তর ফারাক – কেউ কিছুতেই মহা বিরক্ত আবার কারও সারাক্ষন হাসি হাসি মুখ। আমার এই দুটোতেই বিশাল এলার্জি আছে। আমি অতিরিক্ত অভিব্যক্তি দেখানোকে কেন জানি পছন্দ করি না। এর অন্যতম কারন আমি একদমই ধারনা করতে পারি না মানুষটার অতিরিক্ত অভিব্যক্তি দেখানোর কারন।

এইখানে রাস্তায় অনেক মানুষ দেখি – বিভিন্ন দেশের মানুষ গাদাগাদি করে সকালে বাসে-ট্রামে-ট্রেনে চলাফেরা করে। বিচিত্র এদের চেহারা, পোষাক, চালচলন। তবে একটা জিনিষ সবার জন্য একই – তা হলো নিয়ম। এইখানে নিয়মের বাইরে মানুষকে যেতে দেয়া হয় না এবং মানুষ চেষ্টাও খুব একটা করে না। নিজের দেশে সবাই এমনি করে খানিকটা নিয়ম মেনে চললে যে অনেক সুন্দরভাবে চলাফেরা করা যায় – এই ব্যাপারটা কাউকে বললে... – বলবে এইটা অসম্ভব, কারন তা ধারনারও অতীত। ঃ(

শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১১

দিনাতিপাত-৮

সারাদিন অফিস করি, সন্ধ্যায় নিয়ম করে বাসায় যাই – আটপৌড়ে জীবন বলা যায়। ছকের বাইরে কিছুই করি না, ছক মেনে চলা। মাঝে মধ্যে চরকায় যেমন সুতা আটকে যায়, তেমনি মাঝে সাঝে নিজেকেও বাঁধা-ছাড়া করতে ইচ্ছে করে। আটকে থাকা সময় থেকে নিজেকে খানিকটা সরিয়ে ফেলে নিজের জন্য কিছু ভাললাগাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সময়ের আষ্টেপৃষ্ঠে নিজেকে যেভাবে বেঁধে ফেলেছি, সেখান থেকে চাইলেই নিজেকে ছুঁড়ে ফেলা যায় না; সময়, পরিস্থিতি আর দায়িত্ব আমাকে দিনের পর দিন নিখুঁত ভাবে বেঁধে ফেলেছে। সাময়িক ছুটি নেবার অভিলাষী হলেও পরিস্থিতি আটকে ফেলে। তাই মাঝে মধ্যে ব্লগ লিখি, আগে খেরোখাতায় হাত চালাতাম – এখন কম্পির কি-বোর্ডে। পার্থক্য বলতে এইটুকুই ...


মাঝে মাঝে মেজাজ অসাধারন খারাপ থাকে, আবার মাঝে মাঝে নিজেকে নিজেই চিনতে পারি না – মনের ক্রমাগত পারিবর্তনিক পরিস্থিতি দেখে। দেশে মন খারাপ থাকলে একা একা রাস্তা ধরে হাটতাম, এই খানে সেটা হয়ে উঠে না ... কারন সেই সময় করে ট্রেন ধরা, বাস ধরা আর ট্রাম ধরার বদৌলতে সব ঝেড়ে ফেলতে হয় মন থেকে।


  

বুধবার, ৩ আগস্ট, ২০১১

দিনাতিপাত-৭

চেষ্টা করেও ঘুম আটকে রাখতে পারছি না রোজার দিনে অফিসে। রোজা খুব ভালভাবে ধরেছে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কিছুই করার নাই। আর এই বিদেশ বিভূইয়ে এসে বাংলাদেশের অফিস সময়ের কথা মনে পড়ে যায়। রোজা উপলক্ষে সারা মাস ৩ টায় ছুটি। বাসা কাছে ছিল বিধায় ১৫ মিনিটের মধ্যে বাসায় এসে এ সময় সরাসরি পিঠটান দিতাম বিছানায়। এখন পুরাটা মাস কাটবে ট্রেন এ বসে ইফতার করতে করতে; আর পিঠটান এর ব্যাপারটা মনে হয় আর হবে না।

যাই হোক এবারই প্রথম রোজা রাখছি দেশের বাইরে। ভাল দিক হলো দিনের দৈর্ঘ্য বেশ কম, আবহাওয়া ঠান্ডা ঠান্ডা হয়ে থাকে সবসময়। খালি সমস্যা হলো সংযমের – চারপাশের মানুষ ক্রমাগত যেন যা পারছে গিলছে। এখানে যে যা পারে খেতে থাকে আর বইও একটা হাতে নিয়ে পড়তে থাকে সবসময়। কেঊ আবার kindle এ virtual বইয়ের পাতা উল্টিয়ে কফি খেতে খেতে পড়ে। আজকে দেখলাম রাস্তা পার হচ্ছে এক মহিলা, হাতে বই নিয়ে; সিগন্যালের আওয়াজ শুনে রাস্তা পার হলো কিন্তু চোখ সরে না বই থেকে।

রোযার প্রথম দুদিন পার করলাম, ইফতারের সময় মনটা আনচান করে বনানীর Dish&Desert Restaurant এর হালিম আর জিলাপী খেতে; বনানীর স্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ইফতার কিনা, মানুষের ভীড়, নানা রকম রকমারী ইফতারীর উপাদেয় খাবার (বিস্তারিত লিখলে রোযাটা এখনি ভেঙ্গে যেতে পারে) – এ সব কিছুই এক নিমিষেই যেন হারিয়ে ফেললাম।
  

বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১১

দিনাতিপাত-৬

মানুষ জীবনে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ধরা খায়, এবং ধরা খেয়ে আবার ধরা খাওয়া পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসে। আমিও এর ব্যতিক্রম না, তবে আমি সবসময় কিছু গচ্ছা দিয়েই বের হয়ে আসি। এই যেমন এই মেলবোর্নে এসে আজকে দ্বিতীয়বারের মতো ধরা খেলাম। প্রথম খেয়েছি বাসা ভাড়া ২ সপ্তাহের বেশি দিয়ে, ভাড়া করা বাসায় না থেকেই। কারেন্ট-গ্যাসের সংযোগ না থাকায় বাসায় না উঠে বন্ধুর বাসায় ছিলাম এবং সময়ক্ষেপন না করে ভাড়াটিয়া/বাড়ির দালাল (ভদ্র ভাষায় এদেরকে রিয়েল এস্টেট বলতে ভাল লাগে না) –দের জানানোর পরেও যখন তারা দু’সপ্তাহের পর বাসায় উঠার কয়েকদিন পর যখন চিঠি পাঠায় যে, গত দু’সপ্তাহ (যখন আমি থাকি নাই utility না থাকার কারনে)-এর বাসা ভাড়া দিতে। আমার তখন বিষম খাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। অনেক প্রমান, অভিযোগ, উপযোগ করেও যখন বাড়ির মালিকদ্বয় মেনে নিল না, তখন এই ভীতু আমি ধরা খেলাম ভেবে, বাসা ভাড়ার নামে অনেকগুলো ডলার দিয়ে দিতে বাধ্য হলাম। মনে মনে ভাবলাম বড্ড বোকামি হয়ে গিয়েছিল যে, বাসায় কারেন্ট-গ্যাসের সংযোগ না দেখে – পরদিন গিয়েই বাসার চাবি দালালদেরকে ফেরত দিয়ে না আসা।

এবার পরিচিত একজন বুঝিয়ে বললো যে, আমি কেন concession –এ ট্রেন-বাস-ট্রাম এর টিকেট কাটি না, যেন আমার মতো বোকা আর কেঊ নাই এ ভূবনে। আমিও খুব বোকা বনে ভাবলাম, তাইতো medicare card আছে ওইটা দেখিয়েই বোধহয় কাটা যাবে কম পয়সার টিকেট; শুধু শুধু ডলারের শ্রাদ্ধ কে করে! অতি আনন্দের সাথে স্টেশন মাস্টারের কাছ থেকে টিকেট কাটলাম, এবং মনের খুশিতে কম পয়সার টিকেটে নিয়ে city অভিমুখে যাত্রা করলাম। যাত্রা শেষে টিকেট মেশিনে টিকেট ঢুকিয়ে বের হবার সাথে সাথে অপর পাশে দাড়িয়ে থাকা দুই টিকেট চেকার মামা আমাকে ডাক দিয়ে health card দেখাতে বলে; আমি বের করি medicare; বলে এইটা না হেলথ্‌ কার্ড। এইবার বিপদের তারতম্য আর কার্ডের পার্থক্য বুঝতে পারলাম একযোগে। মামাদের বুঝালাম যে, মামা ভুলে ভুল হয়ে গেছে, এইবার আমারে ছাইড়া দেন। কিন্তু এইটা কি বাংলাদেশ যে, শুকনো কথায় চিড়া ভিজবে; তাই আমিও চিড়া ভিজাইতে পারলাম না। একটা কাগজে নাম ঠিকানা লিখে বলে সময় মতো কাগজ চলে যাবে তোমার ঠিকানায়। বুঝলাম ভূয়া কামে আজাইড়া একটা fine খেলাম। ধরা আর কারে বলে!

[মনে হইতেছে, মিলাদ দেয়ার সময় হয়ে গেছে, আল্লাহই জানে কপালে আর কতো ধরা আছে!]