শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১১

দিনাতিপাত-৮

সারাদিন অফিস করি, সন্ধ্যায় নিয়ম করে বাসায় যাই – আটপৌড়ে জীবন বলা যায়। ছকের বাইরে কিছুই করি না, ছক মেনে চলা। মাঝে মধ্যে চরকায় যেমন সুতা আটকে যায়, তেমনি মাঝে সাঝে নিজেকেও বাঁধা-ছাড়া করতে ইচ্ছে করে। আটকে থাকা সময় থেকে নিজেকে খানিকটা সরিয়ে ফেলে নিজের জন্য কিছু ভাললাগাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সময়ের আষ্টেপৃষ্ঠে নিজেকে যেভাবে বেঁধে ফেলেছি, সেখান থেকে চাইলেই নিজেকে ছুঁড়ে ফেলা যায় না; সময়, পরিস্থিতি আর দায়িত্ব আমাকে দিনের পর দিন নিখুঁত ভাবে বেঁধে ফেলেছে। সাময়িক ছুটি নেবার অভিলাষী হলেও পরিস্থিতি আটকে ফেলে। তাই মাঝে মধ্যে ব্লগ লিখি, আগে খেরোখাতায় হাত চালাতাম – এখন কম্পির কি-বোর্ডে। পার্থক্য বলতে এইটুকুই ...


মাঝে মাঝে মেজাজ অসাধারন খারাপ থাকে, আবার মাঝে মাঝে নিজেকে নিজেই চিনতে পারি না – মনের ক্রমাগত পারিবর্তনিক পরিস্থিতি দেখে। দেশে মন খারাপ থাকলে একা একা রাস্তা ধরে হাটতাম, এই খানে সেটা হয়ে উঠে না ... কারন সেই সময় করে ট্রেন ধরা, বাস ধরা আর ট্রাম ধরার বদৌলতে সব ঝেড়ে ফেলতে হয় মন থেকে।


  

বুধবার, ৩ আগস্ট, ২০১১

দিনাতিপাত-৭

চেষ্টা করেও ঘুম আটকে রাখতে পারছি না রোজার দিনে অফিসে। রোজা খুব ভালভাবে ধরেছে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কিছুই করার নাই। আর এই বিদেশ বিভূইয়ে এসে বাংলাদেশের অফিস সময়ের কথা মনে পড়ে যায়। রোজা উপলক্ষে সারা মাস ৩ টায় ছুটি। বাসা কাছে ছিল বিধায় ১৫ মিনিটের মধ্যে বাসায় এসে এ সময় সরাসরি পিঠটান দিতাম বিছানায়। এখন পুরাটা মাস কাটবে ট্রেন এ বসে ইফতার করতে করতে; আর পিঠটান এর ব্যাপারটা মনে হয় আর হবে না।

যাই হোক এবারই প্রথম রোজা রাখছি দেশের বাইরে। ভাল দিক হলো দিনের দৈর্ঘ্য বেশ কম, আবহাওয়া ঠান্ডা ঠান্ডা হয়ে থাকে সবসময়। খালি সমস্যা হলো সংযমের – চারপাশের মানুষ ক্রমাগত যেন যা পারছে গিলছে। এখানে যে যা পারে খেতে থাকে আর বইও একটা হাতে নিয়ে পড়তে থাকে সবসময়। কেঊ আবার kindle virtual বইয়ের পাতা উল্টিয়ে কফি খেতে খেতে পড়ে। আজকে দেখলাম রাস্তা পার হচ্ছে এক মহিলা, হাতে বই নিয়ে; সিগন্যালের আওয়াজ শুনে রাস্তা পার হলো কিন্তু চোখ সরে না বই থেকে।

রোযার প্রথম দুদিন পার করলাম, ইফতারের সময় মনটা আনচান করে বনানীর Dish&Desert Restaurant এর হালিম আর জিলাপী খেতে; বনানীর স্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ইফতার কিনা, মানুষের ভীড়, নানা রকম রকমারী ইফতারীর উপাদেয় খাবার (বিস্তারিত লিখলে রোযাটা এখনি ভেঙ্গে যেতে পারে) – এ সব কিছুই এক নিমিষেই যেন হারিয়ে ফেললাম।
  

বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১১

দিনাতিপাত-৬

মানুষ জীবনে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ধরা খায়, এবং ধরা খেয়ে আবার ধরা খাওয়া পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসে। আমিও এর ব্যতিক্রম না, তবে আমি সবসময় কিছু গচ্ছা দিয়েই বের হয়ে আসি। এই যেমন এই মেলবোর্নে এসে আজকে দ্বিতীয়বারের মতো ধরা খেলাম। প্রথম খেয়েছি বাসা ভাড়া ২ সপ্তাহের বেশি দিয়ে, ভাড়া করা বাসায় না থেকেই। কারেন্ট-গ্যাসের সংযোগ না থাকায় বাসায় না উঠে বন্ধুর বাসায় ছিলাম এবং সময়ক্ষেপন না করে ভাড়াটিয়া/বাড়ির দালাল (ভদ্র ভাষায় এদেরকে রিয়েল এস্টেট বলতে ভাল লাগে না) –দের জানানোর পরেও যখন তারা দু’সপ্তাহের পর বাসায় উঠার কয়েকদিন পর যখন চিঠি পাঠায় যে, গত দু’সপ্তাহ (যখন আমি থাকি নাই utility না থাকার কারনে)-এর বাসা ভাড়া দিতে। আমার তখন বিষম খাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। অনেক প্রমান, অভিযোগ, উপযোগ করেও যখন বাড়ির মালিকদ্বয় মেনে নিল না, তখন এই ভীতু আমি ধরা খেলাম ভেবে, বাসা ভাড়ার নামে অনেকগুলো ডলার দিয়ে দিতে বাধ্য হলাম। মনে মনে ভাবলাম বড্ড বোকামি হয়ে গিয়েছিল যে, বাসায় কারেন্ট-গ্যাসের সংযোগ না দেখে – পরদিন গিয়েই বাসার চাবি দালালদেরকে ফেরত দিয়ে না আসা।

এবার পরিচিত একজন বুঝিয়ে বললো যে, আমি কেন concession –এ ট্রেন-বাস-ট্রাম এর টিকেট কাটি না, যেন আমার মতো বোকা আর কেঊ নাই এ ভূবনে। আমিও খুব বোকা বনে ভাবলাম, তাইতো medicare card আছে ওইটা দেখিয়েই বোধহয় কাটা যাবে কম পয়সার টিকেট; শুধু শুধু ডলারের শ্রাদ্ধ কে করে! অতি আনন্দের সাথে স্টেশন মাস্টারের কাছ থেকে টিকেট কাটলাম, এবং মনের খুশিতে কম পয়সার টিকেটে নিয়ে city অভিমুখে যাত্রা করলাম। যাত্রা শেষে টিকেট মেশিনে টিকেট ঢুকিয়ে বের হবার সাথে সাথে অপর পাশে দাড়িয়ে থাকা দুই টিকেট চেকার মামা আমাকে ডাক দিয়ে health card দেখাতে বলে; আমি বের করি medicare; বলে এইটা না হেলথ্‌ কার্ড। এইবার বিপদের তারতম্য আর কার্ডের পার্থক্য বুঝতে পারলাম একযোগে। মামাদের বুঝালাম যে, মামা ভুলে ভুল হয়ে গেছে, এইবার আমারে ছাইড়া দেন। কিন্তু এইটা কি বাংলাদেশ যে, শুকনো কথায় চিড়া ভিজবে; তাই আমিও চিড়া ভিজাইতে পারলাম না। একটা কাগজে নাম ঠিকানা লিখে বলে সময় মতো কাগজ চলে যাবে তোমার ঠিকানায়। বুঝলাম ভূয়া কামে আজাইড়া একটা fine খেলাম। ধরা আর কারে বলে!

[মনে হইতেছে, মিলাদ দেয়ার সময় হয়ে গেছে, আল্লাহই জানে কপালে আর কতো ধরা আছে!]

বৃহস্পতিবার, ৩ মার্চ, ২০১১

দিনাতিপাত-৫

আমি যখন অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেই তখন মোটামুটি ৭টা বাজে; ঘুম থেকে উঠি ৬ টার একটু পরে (যদিও আইপডে আলার্ম দেয়া থাকে সকাল ৬টায়)। এত তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙ্গে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করতে কারই বা ভাল লাগে? তবুও বিদেশ বলে কথা, চাইলেই একটু ফাঁকি দিয়ে দেরি করে অফিস যাওয়া যায় না। আমার মেলবোর্নের নিবাসটা কাজের জায়গা থেকে একটু দূরেই হয়ে গেছে, কারন খুব কম সময়ে বাসা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আর যেসব বাসা পছন্দ হয় সেগুলো রিয়েল এস্টেট কোম্পানি দেয় না (না দেয়ার পিছনে অবশ্য আমি যেটা বুঝেছি তা হলো এখানে আমার এখনো history তৈরী হয় নাই যা ভাল বাসার পাবার জন্য অতি দরকারী)।  

যা বলছিলাম! বাংলাদেশে খুব কম ঠান্ডাতেও বেশি শীত লাগতো আর এইখানে তো আসলেই অনেক ঠান্ডা পরে তার উপর রয়েছে হাড় কাপানো কনকনে ঠান্ডা বাতাস। এই বাতাসের প্রকোপ যখন গায়ে লাগে তখন গলা ব্যাথা সাথে সাথে শুরু হয়ে যায়। আর প্রতিদিন এই হিম করা বাতাস উপেক্ষা করে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকি তীর্থের কাকের মতো। তখন খালি মনে হয় – ভাগ্য ভাল কানাডায় যাই নাই...তাহলে আর আমাকে খুঁজে পাওয়া যেতো না। আমার সকল আশা ধন্য করে বাস খানা যখন আসে, তখন খুব সরল আনন্দ হয়, এ আনন্দের কোন প্রকৃতি নাই, এটা এমনি এমনি হয়। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ট্রেন স্টেশনের সামনে নেমে আবারও ঠান্ডা প্রকৃতিকে কাঁচ কলা দেখিয়ে ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকি... এবার আশায় থাকি যদি কোনরকমে একটা বসার জায়গা পাওয়া যায়। শতকরা ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রে আমার আশা পূর্ন হয় না, বরং আজকে যা হলো তাতো ভয়াবহ – দাঁড়ানো অবস্থায় কোথাও ধরতেও পারছিলাম না, ট্রেনের বাঁকের সাথে সাথে আমিও এদিক সেদিক বেঁকে যাচ্ছিলাম। সিডনি-মেলবোর্নে অফিস সময়ে শহর অভিমুখি ট্রেনগুলার বগিগুলা দেখলে মনে হবে আমাদের দেশের ৬ নাম্বার বাসের পরিবেশ থেকে কোন অংশে কম না। এরই মধ্যে অতি আনন্দে হাতল ধরার একটা জায়গা পেলাম এবং খপ করে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে বুঝলাম এখানেও একটা ঝামেলা আছে – আমার হাতটা এক প্রেমিক যুগল কে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে যেন; আমিও কোন বিকার না দেখিয়ে চুপকরে ধরে রইলাম হাতল। কিন্তু বিধিবাম – একটু পরেই প্রেমিক যুগলের ভাব বিনিময় শুরু হলো ওষ্ঠ-অধরের মাখামাখিতে, আর আমি অনুভব করলাম যে আমার হাত আর কোনভাবেই প্রেমকে ব্যরিকেড দিতে পারছে না। আমি হাত সরিয়ে আবার আঁকা বাঁকা ভঙ্গিতে নিজের ভার ঠিক রাখতে থাকি।
[মেলবোর্ন  ট্রেন,  সূত্রঃ অর্ন্তজাল]